দ্বিতীয় অধ্যায় নেকড়ে বধ
সেই কৃশ ছেলেটিই ছিল যে বায়ানের হাতে ধরে নিয়ে যাওয়া ভিক্ষুক। এ মুহূর্তে, এক গুহার ভেতর, সে শঙ্কিত দৃষ্টিতে বায়ানের দিকে চেয়ে আছে। বায়ানের ধাতব চামড়া মিলিয়ে গেছে, কিন্তু তার বুকে গভীর এক ক্ষত রয়ে গেছে, ভেতরের হাড় বেরিয়ে আছে, আর ধূসর আলোয় নাড়িভুঁড়ির নড়াচড়া পর্যন্ত দেখা যায়।
— কী হলো, ভয় পেয়েছো নাকি?
কৃশ ছেলেটির ফ্যাকাশে মুখভঙ্গি তার আতঙ্ক প্রকাশ করছে।
— এতটুকু ছোট আঘাতে যদি এভাবে ভয় পেয়ে যাও, তাহলে ভবিষ্যতে আমার শিষ্য হবে কীভাবে?
ছেলেটি মুখ ভার করে চুপ করে থাকে। সে ক্ষতটা দেখে ভয় পায়নি, বরং এই সন্ন্যাসীর অমানবিক নিষ্ঠুরতা দেখে তার ভয় লাগছে। একমাত্র তার কারণেই, এক সহভিক্ষুক—যার নাম ছিল ছোটু—কতবারের সঙ্গী, সে উড়ন্ত তরবারির কোপে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সে খুব শান্তশিষ্ট ছিল।
— তুমি নাকি সেই ছোট ভিক্ষুকের জন্য আমার প্রতি ক্ষুব্ধ?
বায়ান তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে, যেন তার মনের কথা ধরে ফেলেছে।
— না, না! আমি তো শুধু গুরুজীর চোট নিয়েই চিন্তিত!
কৃশ ছেলেটির কণ্ঠ কাঁপছে।
— তাও ঠিক। তোমাকে যখন দেখলাম ভিক্ষুকদের উপর কতটা কঠোর, তখনই তো জানলাম, তোমাকে নিলে আমার কাজ হবে। মনে রেখো, দয়াহীন না হলে পুরুষ হওয়া যায় না! আমার উত্তরাধিকারী হতে হলে নিষ্ঠুরতাই চাই। একটু দয়া দেখিয়ে নিজের জীবন বিপন্ন কোরো না। এই পৃথিবীতে নিজের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই—বাকিসব ফেলে দিতে হবে!
বায়ানের মুখের পেশি কেঁপে উঠে এ কথা বলে।
— আজ যদি আমি ওই ভিক্ষুককে ছুঁড়ে না দিতাম, আমরা দুজনেই ও মঠের দরজা পেরিয়ে বাঁচতে পারতাম না! ছি, সেই মন্দিরের দরজা ভেতরের দিকে—শুরুতেই বোঝা উচিত ছিল ওটা অশুভ জায়গা!
— যাক, এবার আমি ধ্যান করতে বসবো। তুমি খাবার আর পরিশ্রুত জল খুঁজে আনো, মাংস হলে ভালো!
ছেলেটির মনে আনন্দ জাগে, সে বেরোতে যাবে, এমন সময় বায়ান তাকে আবার ডাকল।
— আগে এখানে আয়!
ছেলেটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে যায়। বায়ান তার বুকের কয়েকটি জায়গায় চাপ দেয়, ছেলেটি আর নড়তে পারে না। তারপর বায়ান তাকে একটি ওষুধ খাওয়ায়। ওষুধ গিলে নেওয়ার পর বায়ান আবার তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুলে দেয়, ছেলেটি স্বাধীন হয়।
— পালাবার কথা ভাবিস না। নইলে... হুঁ-হুঁ!
ছেলেটির মুখ আরও ফ্যাকাশে হয়, সে গুহা থেকে বেরিয়ে যায়।
সবাই বুদ্ধিমান, বায়ান যে ওষুধ খাইয়েছে সেটা নিশ্চয়ই ভালো কিছু নয়। ছেলেটি ভেবেছিল সুযোগ পেয়ে পালাবে—এখন সে স্বপ্নও দেখতে পারছে না। তার ভেবেছিল, সে যেনতেন প্রকারে এক গুরু পেয়েছে, ভবিষ্যতে তার জন্য এক আশ্রয় হবে। এখন স্ত্রীর আশা নেই, আশ্রয়ও মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গুরুটা মনে হয় ভীষণ নিষ্ঠুর, ভীষণ রাগী, ঠিক যেন কোনো অশুভ গুরুচণ্ডাল। যদি কোনো দিন তার মেজাজ খারাপ হয়, ছেলেটিকে মেরে ফেললেও কেউ কিছু বলবে না, বরং সাধু-সন্ন্যাসিনীসমরা হয়তো বাহবা দেবে।
ভেবেছিল ভালো মানুষ হয়ে বেশিদিন বাঁচা যায় না, খারাপ মানুষ হলে আরও কম। সবাই বলে, ভালো মানুষের আয়ু কম, খারাপ লোকের অমর্যাদা যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে। আমি খারাপ হয়েও ভাগ্যগুণে এমন পরিণতি পেতে হল। এই ভাবনায় ছেলেটির মন খারাপ হয়ে আসে, চোখে জল এসে যায়, কিন্তু মনে পড়ে, গল্পে বলে পুরুষ কাঁদে না—এ কথা ভেবে সে জোর করে চোখের জল চেপে রাখে।
— উফ!
হঠাৎ সে চিৎকার দেয়। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে হাঁটতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছে।
রাগে সে কাঠের টুকরোটা আঘাত করতে থাকে। তবু মনের রাগ যায় না, সেটা তুলে ছুঁড়ে ফেলতে যায়। তখন লক্ষ্য করে, এটা কাঠ নয়, গোলাকার এক নল, ধাতবও নয়, পাথরও নয়, অদ্ভুত এক বস্তু। সে সেটা খুলে দেখতে চায়। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ঢাকনা খুলতে পারে না।
— এটা তো ঢাকনা, খুলছে না কেন?
কিছুতেই বুঝতে পারে না। আবার নলের দিকে তাকায়। চাঁদের আলোয় দেখে, এর গায়ে আঁকা রেখাগুলো প্রবাহিত হচ্ছে, যেন রক্তনালির মতো।
এ দেখে সে ভয় পেয়ে যায়, তাড়াতাড়ি ছুঁড়ে ফেলে দেয়। এমন অদ্ভুত বস্তুতে তার মনে অশুভ আশঙ্কা জাগে।
— কে জানে, এটা কোনো অমূল্য রত্ন কিনা!
ভাবতে ভাবতে সে আবার সেটি কুড়িয়ে নেয়, পরীক্ষা করে দেখে, শুধু চাঁদের আলোয়ই এর গায়ে রক্তনালির মতো রেখাগুলো প্রবাহিত হয়। অন্ধকারে রাখলে একেবারে সাধারণ বাঁশের জলের পাত্রের মতো লাগে।
ঢাকনা খুলতে না পেরে ভেতরে কী আছে জানতে পারে না। অনেকক্ষণ দেখে, শুধু নালির মতো প্রবাহ ছাড়া আর কিছু নজরে আসে না।
কী বোঝে না, তবে নিশ্চিত ভাবে, এ জিনিস সাধারণ নয়।
অতএব সে সেটা শরীরে লুকিয়ে রাখে।
— হুঁউউ!
দূর থেকে বন্য জন্তুর ডাক ভেসে আসে। ছেলেটি চমকে ওঠে। তখনই খেয়াল হয়, ভাবতে ভাবতে সে গুহা থেকে বের হয়ে এমন জায়গায় এসে পড়েছে, যেখানে কোথায় আছে, নিজেই জানে না।
— গড়গড়...
এ সময় তার পেটও ডাক দেয়। রাত গভীর হয়ে এসেছে, সে কিছু খুঁজে পায়নি, এমনকি ফেরার পথও মনে করতে পারছে না।
পেটের ভেতরের বিষের কথা মনে হতেই তার মুখ আরও সাদা হয়ে যায়।
— হুঁউউ!
এবার জন্তুর ডাক আরও কাছে আসে।
— হুঁউউ!
এবার সে ভুল শুনেনি—জান্তুর গর্জন স্পষ্ট। দূরে দুটি সবুজ আলো দেখা দেয়—এটা সে জানে, জন্তুর চোখ। কোন জন্তু, তা সে জানে না।
তার হাতের তালু ঘামে ভিজে যায়, মনের মধ্যে ভেসে ওঠে নিজের ছিন্নভিন্ন দেহ জন্তুর খাদ্য হওয়ার দৃশ্য।
— কী করব? কী করব?
মনের মধ্যে চিৎকার করতে থাকে। তবু নিজেকে বারবার শাসায়—ভয় পেলে চলবে না, যতক্ষণ না হাত কাঁপছে।
— আগুন! হ্যাঁ, বন্য জন্তু আগুনে ভয় পায়!
নিজেকে স্থির করে, অবশেষে এই সাধারণ কথা মনে পড়ে। তাড়াতাড়ি শুকনো ডালপালা আর পাইন রেজিন খুঁজে নেয়। ভাগ্য ভালো, জঙ্গলের মধ্যে শুকনো কাঠ পাওয়া সহজ, পাইনও কাছেই, তাই তেলও পায়।
ফায়ারস্ট্রাইকারে আগুন জ্বেলে মশাল তৈরি করে। লাল আগুন তার ফ্যাকাশে মুখে আলো ফেলে—সে একটু হাসে।
মশাল জ্বালালেও বন্য জন্তু যায় না, বরং নিকটে গর্জায়। শব্দে মনে হয়, সেটা বন্য নেকড়ে।
ছেলেটির দেহে ঠাণ্ডা ঘাম। এখন গভীর শরৎকাল, এই সময়ে জঙ্গলে শিকার কম, তাই এ নেকড়ে হয়তো অনেকদিন অনাহারে। অনাহারী নেকড়েকে শুধু আগুনে ভয় দেখানো যাবে না, সে মরিয়া হয়ে উঠতে পারে।
ছেলেটি আধবয়স্ক, দীর্ঘকাল অপুষ্টিতে দুর্বল হয়ে পড়েছে। সে জানে, পূর্ণবয়স্ক নেকড়ের সামনে সে কিছুই না।
— হুঁউউ!
নেকড়ে আক্রমণাত্মক গর্জন দেয়, এখন আর ধৈর্য নেই। সে এখনো ঝাঁপায়নি, কারণ সে শিকার কতটা বিপজ্জনক, তা যাচাই করছে। নেকড়ে খুব চতুর প্রাণী।
এ মুহূর্তে ছেলেটির মন আশ্চর্যভাবে শান্ত। বিস্মিত হয়, কেন হাত কাঁপছে না। সে জানে, নেকড়ের সামনে দুর্বলতা দেখালে মৃত্যু নিশ্চিত।
সে জুতার ভেতর লুকোনো ছুরি বের করে। কবে এক টুকরো মরিচা পড়া লোহার টুকরো নিজে ঘষে ধার করেছিল। মৃত্যুর মুখ দেখে শিখেছে—নিজেকে বাঁচাতে হবে। ছুরির হাতল ছেঁড়া পাটের কাপড়ে বাঁধা, ওটা সে কবরের কাছ থেকে জোগাড় করেছিল।
সে সতর্ক, নেকড়ের আক্রমণের জন্য তৈরি—এক হাতে মশাল, অন্য হাতে ছোট ছুরি, আলোয় দাঁড়িয়ে যেন এক যোদ্ধা।
— হুঁউউ!
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর, অবশেষে নেকড়ে ছুটে আসে ছেলেটির দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটি মশাল নেকড়ের চোখে ঠেলে ধরে। নেকড়ে মাথা সরিয়ে আঘাত এড়িয়ে সামনে ঝাঁপায়।
এই সময়, ছেলেটি বাঁ হাতে ছুরি দিয়ে নেকড়ের শরীরে আঘাত করে।
— হুঁউউ!
— আহ...
নেকড়ে আর্তচিৎকার দেয়, ছেলেটিও মাটিতে পড়ে যায়।
নেকড়ের থাবা প্রচণ্ড শক্তিশালী, ছেলেটির জামাকাপড় ছিঁড়ে যায়, চামড়ায় অসংখ্য ক্ষত—ব্যথায় তার চোখে জল আসতে চায়।
কিন্তু এই যন্ত্রণা তাকে আরও হিংস্র করে তোলে, অন্ধ প্রতিহিংসায় নেকড়ের মাথায় ছুরি চালাতে থাকে। নেকড়ে যন্ত্রণায় মাথা বাড়িয়ে ছেলেটির গলায় কামড়াতে যায়।
ছেলেটি জানে, গলায় একবার কামড়ালে মৃত্যু অবধারিত। তাই যন্ত্রণাসহ্য করে মশালটা গলায় গুঁজে দেয়।
নেকড়ে মশাল কামড়ে ধরে, কিন্তু কপাল খারাপ, আগুনের অংশে দাঁত বসে, পোড়া কয়লায় চিৎকার করে ওঠে। এদিকে ছেলেটি ছুরি দিয়ে নেকড়ের গলায় আঘাত করতে থাকে, রক্তধারা বয়ে যায়।
নেকড়ে ভীত হয়ে পড়ে, কারণ সে দুর্বল—পা-এও শক্তি নেই। পালাতে চায়, কিন্তু ছেলেটি তাকে ছাড়ে না। উল্টে ওর ওপর চেপে বসে, ছুরি গলায় চেপে ধরে। নেকড়ের থাবা মাটি আঁচড়ে, কোনো উপায় নেই—শুধু ছটফট করতে থাকে, চারপাশে ধুলা উড়তে থাকে।
ছেলেটির হিংস্রতা চরমে ওঠে—সে নিজেই নেকড়ের গলায় কামড়ে ধরে, সর্বশক্তি দিয়ে চেপে রাখে।
মুখে গন্ধযুক্ত, উষ্ণ রক্ত ঢুকে পড়ে, তবু সে ছাড়ে না, আরও বেশি কামড়ে ধরে। রক্তমাখা মুখে উন্মাদ হয়ে ওঠে।
— হুঁউউউ—!
নেকড়ের করুণ চিৎকারে পাহাড়-জঙ্গল কেঁপে ওঠে।
কতক্ষণ কেটেছে কে জানে—আলো ফুটতে শুরু করেছে। মাটিতে নেকড়ে মরা পড়ে আছে, তখন ছেলেটির ঘুম ভাঙে।
একটা রাত ধরে সে নেকড়ের গলা কামড়ে ছিল, কখন ঘুমিয়েছে টেরও পায়নি। জেগে উঠে, নেকড়ের মৃতদেহ দেখে, আর নিজেকে সামলাতে পারে না। মুখভর্তি পশম নিয়ে হাউমাউ করে কাঁদে।
কেউ সান্ত্বনা দেয় না, কেউ বাধা দেয় না, অনেকক্ষণ কেঁদে অবশেষে থামে। নিথর দৃষ্টিতে নেকড়ের মৃতদেহের দিকে চেয়ে থাকে, তারপর ময়লা জামার হাতায় চোখ মুছে। অনেকক্ষণ ফুপিয়ে কাঁদে, তবু আর চোখে জল আসে না। সে আগের মতোই স্থির হয়ে দূরের কুয়াশার দিকে তাকিয়ে থাকে, শেষে উঠে দাঁড়িয়ে নেকড়ের মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে হাঁটা ধরল।